"নীরব, নিরস্তিত্বের অভিমুখে " কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের এই কাব্য গ্রন্থে নিহিত রয়েছে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের চিন্তা ভাবনা, দার্শনিক মূল্যবোধ, আদর্শগত ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কথা

 

সাংবাদিক কেকা মিত্র 

কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায় এর নাম এখন সাহিত্য জগতে কারোর অজানা নয়। সম্প্রতি যাপনচিত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায় এর কাব্যগ্রন্থ " নীরব, নিরস্তিত্বের অভিমুখে"।

সৌগত চট্টোপাধ্যায় অল্প বয়স থেকেই কবিতা রচনার কাজে মন দিয়েছেন। মৌলিক কাব্য রচনার পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্য (মূলত: কবিতা) অনুবাদের কাজেও বহুকাল যাবৎ সক্রিয় থেকেছেন। সমান্তরাল ভাবে নানা বিষয় সম্পর্কে লেখাপড়ার মাধ্যমে সভ্যতার সঞ্চিত উৎকর্ষের সঙ্গে পরিচিত হবার তাঁর সুযোগ হয়েছে। যা তাঁর মৌলিক কবিতার শরীরে প্রতিফলিত। যদিও লিরিকধর্মী কবিতা রচনার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব অনস্বীকার্য।

কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের এই নতুন কাব্য গ্রন্থে রয়েছে ৩৮ টি কবিতা। কবি এই বইয়ের প্রথম কবিতা " প্রাণহীন অন্ধকার নির্জনতা" তে লিখছেন বহুক্ষণ সূর্যাস্ত ঘটে গেছে শ্লথগতি নদীটির তিরে, নিরভ্র নদীর বুকে অন্ধকার জাহাজের হলুদ বাতি ফুটে আছে রাত্রির তিমিরে। কবি যেন তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এক নির্জনতার ছবি।

কবি লিখেছেন আর একটি হেমন্ত এসে গেল কবিতায় "আরেকটি হেমন্ত এল, শীত পড়তে কতদিন বাকি? চেতনায় বিষাদ কণিকা জ্বলে ওঠে যেন হলুদ আকাশে লাল পাখি, সকালের সমাচার সাঙ্গ হলে মধ্যাহ্নের বোরডম ঢুকে পড়ে রক্তহীন শূন্যতা কেঁদে ওঠে নিরালোক নিরুত্তাপ ঘরে।"

কবি সৌগত-র কবিতায় ধরা পড়ে শূন্যতার বিষাদময়তা। কবি দূষণ ও নক্ষত্রমালা কবিতায় লিখেছেন " মধ্যরাতের রক্তিম চাঁদ নর্দমায় ডুবে গেলে, মায়াবী অন্ধকার জ্বলে ওঠে স্ফুলিঙ্গের মত।" অধুনা বিকেল শেষ হল কবিতায় কবি লিখেছেন "অধুনা বিকেল শেষ, চারিদিকে গড়িয়ে পড়ছে ধূসর পাথুরে অন্ধকার, চারিদিকে বেসাতির আড়ালে অন্তঃপুরে বহমান মৃত্যুর কারবার।" উৎকণ্ঠা থেকে উত্তরণে কবিতায় কবি লিখেছেন "শীতের বিকেল উৎকণ্ঠায় পুড়ে হারিয়ে গিয়েছে সন্ধ্যার আগমনে / বিকল চেতনা পথে পথে ঘুরে ঘুরে শাণিত বিষাদ হেনেছে কাতর মনে"

এই রকম ভাবে শূন্যতার কুয়াশায় কবিতার শব্দের অন্বেষণে, শীতের প্রারম্ভে, তীব্র শীতের মুখোমুখি, দিন যায় রাত্রি বয়ে যায়, সীমাহীন অন্ধকারে, শীতের আত্মায় স্পন্দিত প্রমুখ কবিতার সারমর্ম যেন এক সুতোয় গেঁথেছেন কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায়। তিনি যেন তাঁর লেখনীতে শীতের রাত্রি আর রাতের অন্ধকার কে কোথায় যেন একটা কল্পনার মায়াজালে বিদ্ধ করেছেন।

আর একটি মৃত্যুর মুখোমুখি কবিতায় কবি লিখেছেন

" আবার লিখছি বুঝি পরাভূত প্রেমের কবিতা অথবা বিযুক্তির স্রোতে অর্পণ করেছি ভালোবাসা বনভূমির অন্ধকারে পুড়ে যায় শহীদের চিতা কবিতার অক্ষমতা বর্ষিত করেছে হতাশা।"

আবার কবি লিখছেন বাগানের অন্ধকারের কাছে বসে কবিতায়.....

অন্ধকারে ছেয়ে গেছে পৌষের বিষন্ন বালিয়াড়ি অজানা গ্যালাক্সি থেকে সমাগত কুয়াশার মত রাত্রির স্টেশন ছেড়ে ছুটে চলেছে দূরপাল্লার রেলগাড়ি স্টেশনের ধুসরতায় ফুটে আছে বাস্তুহারা মানুষের ক্ষত।"

এর পাশাপাশি কবি সৌগত তার আরো একটি গদ্য কবিতা " তোমার রূপসী উজ্জ্বলতার প্রতিমুখ" এ লিখেছেন" তুমি যখন কবিতার মাধ্যম হয়ে ওঠো নিষ্প্রভ সূর্যাস্ত ঠিক তখন অবলীলাক্রমে আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে ডুবে যায়......" কবি যেন বারবার অন্ধকারের এক অজানা যাত্রাপথে নিজেকে খুঁজে বেড়ান তাঁর কবিতায় বারবার প্রতিধ্বনিত হয় "অন্ধকার" নামক শব্দটি।

আবার কবি তাঁর লেখায় শীতকাল নিয়ে বেশ কয়েকটি কবিতা লিপিবদ্ধ করেছেন মনের কল্পনার মিশেলে। বিশেষত শীতকালের জন্য, পয়লা জানুয়ারির তীব্র শীতে, শীতের সায়াহ্নে চুপিসারে, পোষ সংক্রান্তির দিনে, শীতকাল শেষ হয়ে এল, শীতের সন্ধ্যায় তীব্র বিষাদে, রাস্তা প্রমুখ কবিতা গুলো নজর কাড়বে কবিতা প্রেমীদের। এরমধ্যে একটি কবিতা যেমন "রাস্তা " কবিতায় কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন

"শীতকাল মিলিয়ে যাচ্ছে

বহু পুরাতন এই শহরের খাসমহল থেকে

পুরাতন সময়ের নিষ্পিষ্ট ঝরাপাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে

নিগূঢ়, অর্বাচীন বিষন্নতা।"

কবি এই রকম শীতকাল নিয়ে তার মনের নানান অনুভূতি নানা দেখা না দেখা কল্পনার মিশেলে বিভিন্ন শব্দের কারিকুরি তে কবিতা রচনায় এক অনবদ্য জাদু সৃষ্টি করতে পেরেছেন। কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায় এর এই " নীরব, নিরস্তিত্বের অভিমুখে" কাব্যগ্রন্থতে বিশেষ ভাবে নজরে পড়বে "অন্ধকার" শব্দটি। কবি এক রূপক ভাবে সেই শব্দটি তার বেশি কিছু কবিতায় খুব সুন্দর ভাবে প্রয়োগ করেছেন। তার দু একটি উপমা এই কাব্যগ্রন্থ আলোচনায় উল্লেখ করলাম। আমাদের দুজনের দুই বিপরীতমুখী অন্ধকার কবিতায় কবি লিখেছেন

"আমরা দু'জন দু' রকম অন্ধকারের ভাষায় কথা বলছিলাম.....

আমরা দু'জন দু' রকম আলোর শিখা দিয়ে বিদীর্ণ করে ছিলাম পরস্পরকে শব্দের মূর্ছনায় আমরা দুজনেই ভালোবেসেছিলাম.........."

"বস্তুত একলা বনবাসে" কবিতায় কবি লিখেছেন শহরতলী জেগেই থাকে যেমত ফোটে অন্ধকার অন্ধকার ব্যথার বুকে ভালোবাসাও সুর হারায়.........

আবার একটি রাত্রির অন্তরে কবিতায় কবি লিখেছেন "এবার কবিতার কারণে অন্ধকার ধূসর রূপ নেবে বিকলাঙ্গ আকাশ থেকে খসে পড়বে নক্ষত্রমালা কেবল তোমার জন্য একাকীত্ব ডানা মেলে দেবে ব্যর্থ চাঁদ আদিগন্ত বমন করবে যন্ত্রণার জ্বালা.......।"

এই কবিতার পাশাপাশি কবি "উৎসর্গ, তোমাকে নির্ঝরিণী" কবিতায় লিখেছেন "যে ভাবে মহাশূন্যের অসীম অন্ধকার পুড়তে থাকে উদ্ভাসিত নক্ষত্রমালার আগুনের শিখায়..."

এই রকম আরো একটি কবিতা লিখেছেন সৌগত চট্টোপাধ্যায় কবিতার নাম" ম্যাজেন্টা পাখি" সেখানে কবি লিখছেন

"বহুদিন দেখিনি বলে তোমার নিটোল মুখচ্ছবি অবচেতনার অন্ধকারে রূপকের মত ভেসে আছে বহুকাল...."

ঠিক এইরকম কবিতা কামনার শিখা জ্বলে, বইমেলার কয়েকদিন পরে প্রমুখ কবিতা গুলোয় কবিতার আপন ছন্দে নির্মাণ করেছেন অন্ধকারের রূপকথা......। এই কাব্যগ্রন্থের শেষ দিকের একটি ছোট্ট চার লাইনের কবিতা মন ভরায়। "কলকাতা সম্পর্কে" কবিতায় কবি সৌগত লিখেছেন

"কলকাতা আমার রক্তের শিরায় শিরায় স্পন্দমান রক্ত কণিকা,

কলকাতা আমার ছোটবেলার খেলাঘর ভাঙার বিষন্নতা কলকাতা আমার চোখের তারায় প্রজ্জ্বলিত নীহারিকা

কলকাতা আমার অবসাদের ভোর, অন্তহীন জীবন সমুদ্রের নির্জনতা।" আসলে আমাদের এই কলকাতা আমাদের কাছে যেন অক্সিজেন। কবি সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই এই কবিতা রচনা করেছেন যা আসলে আমার আপনার মনের কথা....!

এবার চলে আসবো এই কাব্য গ্রন্থর শেষ কবিতার কথায়। কবি তার চেতনা বোধ দিয়ে "পুরোনো সুর, রেলগাড়ির বাঁশি" কবিতায় এক অসাধারণ নস্টালজিয়া ফুটিয়ে তুলেছেন আপন ছন্দে......

তিনি লিখেছেন

"ছায়ার ভিতর নিহিত কালো ছায়া অবলীলায় মনের প্রবাহতে বাড়তে থাকে ছড়িয়ে তার কায়া তুমি তখন বিলাসী বাংলোতে..।" কবি এই কবিতার শেষ স্তবকে লিখেছেন "প্রতিটি দিন ধূসর গোধূলিতে বাড়ি ফেরার সময়ে বেজে ওঠে ট্রেনের বাঁশি তীক্ষ্ম সঙ্গীতে অন্ধকার ঢেউ-এর মত ফোটে।"


কি অপূর্ব ছন্দের কারুকাজ এবং রেলগাড়ির আওয়াজ, ট্রেনের বাঁশি, শৈশবের স্মৃতি সব মিলিয়ে সুন্দর উপস্থাপনা এই কবিতায় বর্ণিত হয়েছে।

কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের 'নীরব, নিরস্তিত্বের অভিমুখে গ্রন্থটির নামকরণ এবং অবশ্যই সেই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলি মনে পড়ায় সারত্রের মৌলিক ও প্রামাণ্য দার্শনিক অবদান সমৃদ্ধ লেত্র এ লে নেয় নামাঙ্কিত দুর্মূল্য গ্রন্থটিকে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে যে আদর্শগত ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট বুদ্ধিজীবি, ভাবুক এবং ব্যতিক্রমী ভাবনা ও পথের সন্ধানী লেখক ও সাহিত্য রসিকদের দার্শনিক নবমূল্যায়নের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণকে অনিবার্য করে তুলেছিল, একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে যেন সেই চিন্তা ভাবনার আলোড়ন বাংলা কবিতার হাত ধরে সাহিত্যের বিচরণভূমিতে ফিরে এল, কবি সৌগতর এই বইটা পড়ে সেটাই অনুধাবন করা যায়। তাই হয়তো তিনি এই বইটি উৎসর্গ করেছেন উপমহাদেশের বিস্তৃত, বিবর্ণ, অন্ধকার কে....।

এই বইতে চিন্ময় মুখার্জির প্রচ্ছদ বইয়ের কবিতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্ভুল বানান, সুন্দর ছাপা এই ৬৪ পাতার কাব্যগ্রন্থ টি কবিতা প্রেমীদের নজর কাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। ভিন্ন স্বাদের কবিতা যারা পড়তে ভালোবাসেন বইটি কিনতে পারেন, আপনাদের সংগ্রহে রাখতে পারেন।


বইয়ের নাম: নীরব, নিরস্তিত্বের অভিমুখে লেখক: কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায় প্রকাশক: যাপনচিত্র ফাউন্ডেশন দাম: ২০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

ICCR হলে " বঙ্গরত্ন সন্মান " পেলেন বিশিষ্ঠ সেতার শিল্পী বাণী মুখোপাধ্যায়

তপন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হলো দিল্লি রুম থিয়েটারের নাটক " সূর্য নেই স্বপ্ন আছে " এই নাটক এক কথায় সময় উপযোগী প্রযোজনা

মুক্তির প্রতীক্ষায় সোমনাথ সেন পরিচালিত ছবি পাখির বাসা