চেতলার অহিন্দ্র মঞ্চে সিনি পালন করলো " বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবস

 


সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ আইচ 
একদিকে দুই বছরের সন্তানকে ফিরে পাওয়া মায়ের কৃতজ্ঞতা। অন্যদিকে, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বড়রা কতটা কাজ করেছেন—শিশু সংসদের এক প্রতিনিধির সোজাসাপটা প্রশ্ন। শনিবার কলকাতায় বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবসের রাজ্যস্তরের অনুষ্ঠানে এই দুই মুহূর্তই যেন দিনের মূল বার্তা হয়ে উঠল—জীবন বাঁচানো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য নীতিকে বাস্তব কাজে রূপ দিতে হবে।

বাড়ির কাছের একটি পুকুরে দুই বছরের শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় ভাসতে দেখা গিয়েছিল। জল থেকে তোলার পর তার কোনও সাড়া মিলছিল না। সেই কঠিন মুহূর্তে এগিয়ে আসেন সিনির প্রশিক্ষিত সমাজ প্রতিনিধি মঞ্জু ও সোনামণি। স্থানীয় এক গ্রামীণ চিকিৎসকের সহায়তায় তাঁরা শিশুটিকে জরুরি প্রাথমিক সহায়তা দেন এবং জীবন দায়ী সি পি আর দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু নিকটতম সরকারি হাসপাতালটি ছিল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে। শিশুটির গুরুতর অবস্থা এবং দীর্ঘ পথ—দুই মিলিয়ে লড়াইটি সহজ ছিল না। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন। সরকারি হাসপাতালের সক্রিয় ভূমিকা, গ্রামের সাধারণ মহিলাদের প্রাথমিক চিকিৎসা বা সি পি আর সহায়তা এবং শিশুটি প্রাণে বেঁচে যায়। অনুষ্ঠানে শিশুটির মা বাবা মঞ্জু, সোনামণি, স্থানীয় গ্রামীণ চিকিৎসক এবং সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়, জলে ডোবার পর প্রথম কয়েক মিনিটের পদক্ষেপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জরুরি দ্রুত পরিবহণ ও সময়মতো চিকিৎসা।

চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউটের (সিনি) আয়োজনে এদিন মঞ্জু ও সোনামণিসহ বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজের প্রতিনিধিদের সম্মানিত করা হয়। সাম্প্রতিক জল-সম্পর্কিত বিপদে সাহস ও তৎপরতার সঙ্গে মানুষকে উদ্ধার করার জন্য কলকাতা পুলিশ পরিবারের পাঁচ সদস্যকেও বিশেষ সম্মান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে কলকাতা পুলিশের দেবাশিস বৈদ্য জানান, জল-সম্পর্কিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত কর্মী, জেট স্কি এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষকে নদী, পুকুর এবং অন্যান্য জলাশয়ের কাছে সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান।

সিনির দাবি, ইতিমধ্যে ৮,০০০-এর বেশি সমাজের সদস্য এবং প্রথম সারির কর্মীকে সিপিআর ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষিত মানুষেরা নিজেদের এলাকায় বিপদের সময় পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছেন। সিনির সম্পাদক ও সিইও ডা. ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য বলেন, “যে সমাজের মানুষের সঙ্গে আমরা কাজ করি, তাঁরাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। প্রশিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিরা সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে জীবন বাঁচাচ্ছেন। সমাজকে প্রস্তুত করা গেলে পরিবর্তন সম্ভব।” তবে জীবন বাঁচানোর এই সাফল্য উদ্‌যাপনের মধ্যেই বড়দের সামনে কঠিন প্রশ্ন রাখে দক্ষিণ দিনাজপুরের একটি শিশু সংসদের মুখ্যমন্ত্রী।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রক **ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের সরকারি নির্দেশিকা** প্রকাশ করেছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে শিশু প্রতিনিধি জানতে চায়—২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ওই জাতীয় নির্দেশিকাকে বাস্তবে রূপ দিতে সিনি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা এগিয়েছে? প্রশ্নটি ছিল ছোট, কিন্তু তার পরিধি বড়। কারণ নীতি প্রকাশের পর তা কতটা বাস্তবায়িত হল, কোথায় অগ্রগতি হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়ে গেল—তার স্পষ্ট উত্তরই শেষ পর্যন্ত শিশুদের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

“ইউনাইট টু টার্ন দা টাইড” ভাবনাকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল সিনির বহু-রাজ্যভিত্তিক বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ প্রচারের অংশ। গত ১০ জুলাই ওড়িশা থেকে এই প্রচারের সূচনা হয়। 

অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, কলকাতা পুলিশ, রামকৃষ্ণ মিশন এর প্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগী এবং বিভিন্ন জেলার মানুষ অংশ নেন। ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের অতিরিক্ত মহানির্দেশক ডা. মানস প্রতিম রায় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইনজুরি বিষয়ক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. মহম্মদ আশিল তথ্যপ্রমাণ-ভিত্তিক যৌথ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন।

তাঁরা বলেন, জলে ডোবা প্রতিরোধে সরকার, পঞ্চায়েত, স্থানীয় প্রশাসন, জরুরি পরিষেবা, গবেষক, নাগরিক সংগঠন এবং সমাজের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।।রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন এবং ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিজের ভিডিও বার্তায় প্রশিক্ষণ, অংশীদারিত্ব এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ফ্লোট টু লিভ জল থেকে নিরাপদ উদ্ধার এবং সিপিআরের ব্যবহারিক প্রদর্শন করা হয়। শিশু সংসদের সদস্য এবং জলে ডোবা প্রতিরোধ দলের নাটকের মাধ্যমে সহজ জল-সুরক্ষা বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। সিনির লিড—ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি, সুজয় রায় বলেন, “একটি জীবন বাঁচানো মানে শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়; একটি পরিবারকে অপূরণীয় ক্ষতি থেকে বাঁচানো। স্থানীয় সহায়তা এবং কার্যকর সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয়ই এই উদ্যোগের আসল শক্তি।”

অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে, মঞ্চের আলোও নিভেছে। কিন্তু শিশু সংসদের সেই ছোট্ট মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে—২০২৩ সালের জাতীয় নির্দেশিকার পর বাস্তবে কতটা এগোলেন বড়রা?

এখন সময়ই বলবে, শিশুটি তার প্রশ্নের উত্তর কবে পাবে এবং সেই উত্তর শুধু কথায় থাকবে, নাকি মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে সত্যিই দেখা যাবে?

Comments

Popular posts from this blog

ICCR হলে " বঙ্গরত্ন সন্মান " পেলেন বিশিষ্ঠ সেতার শিল্পী বাণী মুখোপাধ্যায়

তপন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হলো দিল্লি রুম থিয়েটারের নাটক " সূর্য নেই স্বপ্ন আছে " এই নাটক এক কথায় সময় উপযোগী প্রযোজনা

মুক্তির প্রতীক্ষায় সোমনাথ সেন পরিচালিত ছবি পাখির বাসা