জলে ডুবে মৃত্যু রুখতে সিনি এবং বহরমপুর প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ

সাংবাদিক কেকা মিত্র :জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ১০ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা মাসব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারের অংশ হিসেবে দুই দিনব্যাপী বহরমপুর ব্লক এবং মুর্শিদাবাদ জিয়াগঞ্জ ব্লকের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা দপ্তর এবং চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট (সিনি)-এর যৌথ উদ্যোগে ব্লক-স্তরের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। জলে ডুবে মৃত্যু কমাতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় স্তরে কার্যকর উদ্যোগ গড়ে তোলাই ছিল এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য।

কর্মশালায় বিডিও, জয়েন্ট বিডিও সহ বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, সদস্য, এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট, গ্রাম পঞ্চায়েত কর্মী ও সহায়ক, সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের সুপারভাইজার, জলসাথী, সিভিক পুলিশ, সিভিক ডিফেন্স স্বেচ্ছাসেবক, ভেক্টরবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মী-সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সিনির সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার সায়নী অধিকারী, মুর্শিদাবাদ দপ্তর থেকে উপস্থিত ছিলেন সহকারি পরিচালক জয়ন্ত চৌধুরী ,পার্থসারথি মণ্ডল, ইদ্রিস আলী, তপন হাজরা এবং দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে আগত সিপিআর প্রশিক্ষক ইতি ঘোষ মণ্ডল ও তারা হালদার।

কর্মশালায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ নির্দেশিকার ভিত্তিতে সিনি গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলি তুলে ধরা হয়। শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান, জলাশয়ের ধারে নিরাপদ আচরণ, দুর্ঘটনার সময় কীভাবে দ্রুত উদ্ধার করতে হবে, সিপিআর প্রশিক্ষণের গুরুত্ব এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

"জলে ডুবে মৃত্যু রুখতে সচেতনতার কোনও বিকল্প নেই। পরিবার, স্কুল, প্রশাসন এবং সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে," বলেন বহরমপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর শাফিরুল শেখ।

"এই ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় শক্তি। পাশাপাশি সিপিআর শেখা এখন সময়ের দাবি। কারণ সঠিক সময়ে এই দক্ষতা একটি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে," বলেন বহরমপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি সুবীর মণ্ডল।

সমাপনী বক্তব্যে ব্লক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আধিকারিক গৌরব মণ্ডল বলেন, "জলে ডুবে মৃত্যুর শিকার শুধু শিশুরা নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও হন। নদী বা জলাশয়ে কাজ করতে গিয়ে, নৌকায় যাতায়াতের সময় কিংবা অসতর্কভাবে জলে নামলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। তাই জলসাথী-সহ সকলকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।"

কর্মশালার দ্বিতীয় দিনেও মুর্শিদাবাদ জিয়াগঞ্জ ব্লকেও যথেষ্ট সাড়া ফেলে এই সচেতনতামূলক প্রচার।। বিডিও মানস কুমার বাগ ট্রেনিং নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করে সকলের উদ্দেশ্যে বলেন সিপিআর ট্রেনিং টি সবাই যদি পায় তাহলে খুবই ভালো হয়। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন এরকম ট্রেনিং যদি এখানে হয় তাহলে তিনি নিজেও  পুরো ট্রেনিং এ অংশগ্রহণ করবেন।


অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিভিক ভলেন্টিয়ার রাও এই ট্রেনিং টি পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং কিভাবে কি নাম নথিভূক্ত করা যায় সে বিষয়েও প্রশ্ন করেন।।

উপস্থিত সুপারভাইজার, সিভিক পুলিশ এবং  জলসাথী প্রত্যেকেই স্বীকার করেন যে সিপিয়ার কথাটা তাদের জানা থাকলেও এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান তাদের কারোরই নেই। তাই এটি যদি হাতে-কলমে শেখা যায় তাহলে তাদের পক্ষে সুবিধা হবে। এছাড়াও পুকুরভিত্তিক যে সুইমিংপুল সেটাও যদি এখানে চালু করা যায় তাহলেও বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর পক্ষে খুব ভালো হয় এবং তারা সবাই চান যাতে প্রত্যেকটি পঞ্চায়েত লেভেলই এই প্রশিক্ষণ টি দেওয়া হয়। তারা এও বলেন প্রত্যেকটি পঞ্চায়েত লেভেল এই যদি ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয় যারা এই জলে ডোবার সংবাদ পাওয়া মাত্রই তৎক্ষণা যাতে উদ্ধার কার্যে এগিয়ে আসতে পারে।

অনুষ্ঠান শেষে  জয়ন্ত চৌধুরী বলেন বিডিও সাহেবের তৎপরতায় এবং সকল সরকারি কর্মীদের সহায়তায় সিনি মুর্শিদাবাদে আগামী দিনের জন্য একটি অ্যাকশন প্ল্যানও তৈরি করবে,এই ট্রেনিং টিকে  কিভাবে আরো কার্যকর করে তোলা যায় এবং সমস্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং প্রথম শ্রেণীর কর্মীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ জলে ডুবে প্রাণ হারান। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিনি জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করে চলেছে।

এ বছরের বিশ্ব জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য "একজোট হই, পরিবর্তনের জোয়ার তুলি"। সেই বার্তা সামনে রেখে সিনি পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, অসম-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ১০ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ, পরামর্শসভা, বিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে। বহরমপুরের এই কর্মশালা সেই মাসব্যাপী প্রচারাভিযানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

কর্মশালার শেষে উপস্থিত সকলেই নিজ নিজ এলাকায় জলে ডুবে মৃত্যু রোধে সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ আচরণ গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

Comments

Popular posts from this blog

ICCR হলে " বঙ্গরত্ন সন্মান " পেলেন বিশিষ্ঠ সেতার শিল্পী বাণী মুখোপাধ্যায়

তপন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হলো দিল্লি রুম থিয়েটারের নাটক " সূর্য নেই স্বপ্ন আছে " এই নাটক এক কথায় সময় উপযোগী প্রযোজনা

মুক্তির প্রতীক্ষায় সোমনাথ সেন পরিচালিত ছবি পাখির বাসা