আগামীকাল থেকে পালিত হবে ইস্কন আয়োজিত ৫৫ তম কলকাতা রথযাত্রা উৎসব ২০২৬
সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ আইচ:
ইস্কন এর এবারের ৫৫ তম রথযাত্রা উৎসবের এবারের থিম: "ভারতের ভূমি-মন্দির সংস্কৃতির ঐতিহ্য" আজকের এই অশান্ত ও অস্থির পৃথিবীতে প্রতিটি হৃদয় ভরে উঠুক আনন্দ, পরিতৃপ্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও শান্তির আলো। -এই আন্তরিক প্রার্থনাই পঞ্চান্নতম কলকাতা রথযাত্রার মূল বার্তা। ইস্কন কলকাতার উদ্যোগে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক মহোৎসবের রথের চাকা এগিয়ে চলেছে সমগ্র বিশ্বের মঙ্গল, মানবকল্যাণ, সম্প্রীতি, শান্তি ও আনন্দের প্রার্থনা নিয়ে। ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবীর করুণাময় আশীর্বাদে এই রথযাত্রা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার সকল ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানবতার এক মহামিলনের আহ্বান জানায়।
কলকাতা রথযাত্রা - ভারতের ভূমি, মন্দির সংস্কৃতির ঐতিহ্যকলকাতা রথযাত্রা ভারতের চিরন্তন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত প্রকাশ, যেখানে মন্দির সংস্কৃতির পবিত্র ধারা রাজপথে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই উৎসব ভক্তি, সেবা, ঐক্য, সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির মতো ভারতের শাশ্বত মূল্যবোধকে ধারণ করে বিশ্ববাসীর সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আজ বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার আবহ বিরাজ করছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা যেন মানবসভ্যতার মাথার ওপর ভাসমান। এমন এক সময়ে ইস্কন কলকাতা নিয়ে আসছে শান্তি, সম্প্রীতি, আশা ও মানবঐক্যের এক চিরন্তন বার্তা।
ইস্কন কলকাতার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ঐতিহাসিক পঞ্চান্নতম বার্ষিক কলকাতা রথযাত্রা। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বিশ্বমানবতার উদ্দেশ্যে শান্তি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের এক আন্তরিক আহ্বান। গত বছর কলকাতার রাজপথে আমরা এক বিরল ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী ছিলাম। ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথের সামনে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ভক্তরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নৃত্য ও কীর্তনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দুই দেশের মানুষের সেই মিলন যেন এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করেছিল-বিশ্বের অধিপতি জগন্নাথের সামনে জাতি, দেশ ও সীমান্তের সব বিভেদ মুছে যায়; আমরা সবাই এক বিশ্বপরিবারের সদস্য। গত বছর রথযাত্রার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল রথের চাকার পরিবর্তন। বহু বছর ধরে ব্যবহৃত, বিখ্যাত বোয়িং ৭৪৭ বিমানের চাকার পরিবর্তে রথে সংযোজিত হয় সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমানের চাকা। আকাশে যে চাকা যুদ্ধের কঠিনতম পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নির্মিত, সেই চাকা আজ ভগবান জগন্নাথের রথ বহন করছে-যুদ্ধের শক্তিকে শান্তির সেবায় উৎসর্গ করার এক অনন্য প্রতীক হিসেবেই আমরা এই বার্তা তুলে ধরেছিলাম।
এ বছর আমাদের আহ্বান আরও গভীর। মানুষের মন যতই অশান্ত হোক, যতই হতাশা, বিভেদ ও অনিশ্চয়তা ঘিরে থাকুক না কেন, রথযাত্রার প্রার্থনা, হরিনাম সংকীর্তন এবং ভগবান জগন্নাথের করুণায় প্রতিটি হৃদয় ভরে উঠুক শান্তি, প্রশান্তি, সম্প্রীতি ও আনন্দে। কলকাতা রথযাত্রা আজ শুধু কলকাতার নয়, এটি এক বিশ্বউৎসব-যার স্পন্দন কলকাতা থেকে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে।
বিশেষ আকর্ষণ এ বছরের পঞ্চান্নতম কলকাতা রথযাত্রার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হবে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়ের শুভ উপস্থিতি। তিনি ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসবের শুভ সূচনা করবেন। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে তিনি ভগবানের রথের সম্মুখভাগে প্রতীকী 'ছেড়া পাহাড়া' (Chera Pahara) সেবায় অংশগ্রহণ করে স্বর্ণঝাড় দিয়ে পথ পরিশোধন করবেন। এরপর তাঁর হাতেই রথের প্রথম রশি টানার মাধ্যমে পঞ্চান্নতম কলকাতা রথযাত্রার শুভ সূচনা হবে।
এই শুভ অনুষ্ঠানে অসংখ্য ভক্ত, বিশিষ্ট নাগরিক এবং দেশ-বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে কলকাতা আবারও ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের করুণা, শান্তি ও মানবকল্যাণের বার্তায় মুখরিত হয়ে উঠবে।
আজ বিশ্বজুড়ে ১৫০টিরও বেশি দেশে, ৪,০০০-এর বেশি স্থানে রথযাত্রা পালিত হচ্ছে, যা সম্ভব হয়েছে ইসকন-এর প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য, কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। তাঁর শৈশবে কলকাতার বড়বাজারে রথযাত্রা দেখেই জন্ম নিয়েছিল এই বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন। ১৯৬৭ সালের ৯ই জুলাই আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে প্রথম আন্তর্জাতিক রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর ইচ্ছা ছিল, বিশ্বের প্রতিটি শহরে জগন্নাথের রথ পরিভ্রমণ করুক, আর মানুষ একত্রিত হোক ভক্তি ও শান্তির বন্ধনে। কলকাতার রথযাত্রা, যা পুরীর পরেই সবচেয়ে বড়, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষকে আকৃষ্ট করে, এবং গোটা শহর রঙ্গীন হয়ে ওঠে ভক্তি, আনন্দ আর উৎসবের রঙে।
ইসকন কলকাতা ৫৫তম রথযাত্রা ও উল্টো রথের শোভাযাত্রার সময়সূচি ও রুট শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ উদ্বোধনের সময়: দুপুর ১২টা শুরুর স্থান: ইসকন কলকাতা মন্দির, ৩জি, আলবার্ট রোড, কলকাতা রুট: ইসকন কলকাতা মন্দির হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট এ.জে.সি. বোস রোড শরৎ বসু রোড হাজরা রোড → শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (এস.পি. মুখার্জি) রোড এক্সাইড ক্রসিং জওহরলাল নেহেরু (জে.এল. নেহেরু) রোড আউটরাম রোড ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড।
শ্রীশ্রী বলরামজীর রথউচ্চতা: ৩৬ ফুট। চারটি প্রায় সাড়ে চার ফুট ব্যাসের শক্তিশালী লোহার চাকা রথটিকে অধিক স্থিতিশীল ও দৃঢ়তা প্রদান করে।রথের সামনে দক্ষ দক্ষিণ ভারতীয় শিল্পীরা তৈরি করবেন মনোমুগ্ধকর রঙ্গোলী বা রাস্তার আলপনা, প্রাকৃতিক রঙের আবীর ব্যবহার করে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংকীর্তন শিল্পীরা, ডজন খানেক মৃদঙ্গ ও করতালের সঙ্গে, গর্জন তুলবেন কীর্তনের। শিশুদের ঝাঁকি, প্রসাদ বিতরণ বাস, আর লক্ষ লক্ষ ভক্তের আনন্দঘন উপস্থিতিতে কলকাতা রূপ নেবে এক বিশাল আধ্যাত্মিক মেলার।ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জগন্নাথ মহামেলা ১৭ জুলাই (শুক্রবার) থেকে ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার), ২০২৬ কলকাতার পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনের বিপরীতে অবস্থিত ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বর্ণাঢ্য শ্রীশ্রী জগন্নাথ মহামেলা। এ বছরের মহামেলার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হলো গুণ্ডিচা মন্দিরের মনোরম প্রতিরূপ, যা তিরুপতির শ্রী বালাজি মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত হচ্ছে। এই নান্দনিক স্থাপত্য দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে এবং মহামেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে সকলকে মুগ্ধ করবে।
এই সাতদিনব্যাপী মহামেলায় ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবী ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিরাজ করে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের দর্শন প্রদান করবেন। সকলকে এই পবিত্র উৎসবে সপরিবারে অংশগ্রহণ করে ভগবানের কৃপা লাভের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।প্রতিদিনের প্রধান আকর্ষণ বিকেল ৩:৩০টা থেকে রাত ৮:৩০টা পর্যন্ত সকল দর্শনার্থীর জন্য সুস্বাদু খিচুড়ি মহাপ্রসাদ পরিবেশন।প্রতিদিন সন্ধ্যায় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খ্যাতনামা নৃত্যদলের পরিবেশনা, ডোনা গাঙ্গুলীর নৃত্যদল ও পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীদের বিভিন্ন পরিবেশনা। হৃদয়স্পর্শী ভক্তিমূলক নাট্যাভিনয়। প্রাণময় হরিনাম সংকীর্তন। অনুপ্রেরণামূলক আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক আলোচনা। আসুন, ভক্তি, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলায় অংশগ্রহণ করে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের কৃপা ও মহাপ্রসাদ গ্রহণের সৌভাগ্য লাভকরি।উৎসবের প্রার্থনা আজকের এই অশান্ত ও অস্থির পৃথিবীতে আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা প্রত্যেকটি হৃদয় ভরে উঠুক আনন্দ, পরিতৃপ্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং শান্তির আলোয়।ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের করুণায় মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হোক প্রেম, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণের চেতনা। ব্যক্তি, সমাজ এবং সমগ্র বিশ্বের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, ঐক্য ও শুভবোধ। এই সর্বজনীন শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণের প্রার্থনাই ইসকন কলকাতার ৫৫তম রথযাত্রা মহোৎসব এর মূল লক্ষ্য।



Comments
Post a Comment