ওয়ার্ল্ড রিভার ডে: কলকাতার রিভারফ্রন্ট ও বেনারসের ধাঁচে ঘাট তৈরির দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রকাশ করল ইডেন রিয়েলটি, সাথে ১৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ


সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ আইচ 

আগামীকাল ২৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার 'ওয়ার্ল্ড রিভার ডে' (বিশ্ব নদী দিবস)। এই উপলক্ষেই হুগলি নদীর তীরে ঐতিহ্য ও নগরোন্নয়নের এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটতে চলেছে। হাওড়ার রিভারফ্রন্টে বেনারসের ধাঁচে গঙ্গা ঘাট নির্মাণের নকশা ও উন্নয়ন রোডম্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল ইডেন রিয়েলটি গ্রুপ। 'ইডেন দেবপ্রয়াগ' প্রকল্পের অধীনে তৈরি এই ঘাট দুটি শহরের নদীকেন্দ্রিক আকর্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

এই উদ্যোগটি গঙ্গা নদীর ঐতিহ্য বজায় রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের এক নতুন অধ্যায় সূচনা করছে। এটি কলকাতা ও হাওড়া জোড়া শহরে আধুনিক আবাসন, সাধারণ মানুষের ব্যবহারযোগ্য পরিকাঠামো এবং নদীর পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করবে।

নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহর

১৬৯০ সালে হুগলি নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল কলকাতার জনবসতি। সেই থেকে এই নদী শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মূল আধার। প্রায় ২,৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গার এই শাখা নদীটির ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছেন ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ। হাওড়া শহরের জন্যও হুগলি নদী একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যার তীরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (১৭৮৭) এবং আইআইইএসটি শিবপুর। যদিও বাবুঘাট বা প্রিন্সেপ ঘাটের মতো ঐতিহাসিক ঘাটগুলি আজও প্রাণবন্ত, তবু হাওড়ার দিকের নদী তীরের অনেকটাই এখনও সেভাবে ব্যবহৃত হয় না।

হুগলির তীরে বেনারসের আবহ

বারাণসীর বিখ্যাত ঘাটগুলি (৮০টিরও বেশি পাথরের সিঁড়ি) বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় নদীকূলীয় এলাকা, যেখানে আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠান ও জনসংযোগ একসাথে ঘটে। ইডেন রিয়েলটি সেই ঐতিহ্যকেই আধুনিক হাওড়ায় ফিরিয়ে আনছে।

প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

ধাপযুক্ত রিভারফ্রন্ট ঘাট: শিবপুরের লোয়ার ফোরশোর রোডে ১০০ মিটার দীর্ঘ ল্যান্ডস্কেপযুক্ত ধাপ বিশিষ্ট রিভারফ্রন্ট ঘাট।

সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো ও গঙ্গা আরতি: ঘাট সংলগ্ন এলাকায় থাকবে বিশেষ 'গঙ্গা আরতি জোন' এবং বড় আকারের উৎসব ও অনুষ্ঠানের জন্য একটি ব্যাঙ্কোয়েট হল। ব্যাঙ্কোয়েটের ছাদে থাকছে একটি ওপেন-এয়ার সুইমিং পুল এবং পার্টি লন, যেখান থেকে গঙ্গার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যাবে।

সাধারণ মানুষের জন্য ওয়াকওয়ে ও আলো: নদীর ধার ঘেঁষে সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য একটি সুন্দর ওয়াকওয়ে (Promenade) থাকবে। রাতে বিশেষ হেরিটেজ লাইটিং দিয়ে পুরো ঘাট সাজানো হবে, যা সন্ধ্যার আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

নদী তীর সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষা: জোয়ার-ভাটার কারণে জলের স্তরের তারতম্য এবং নদীর স্রোত সামলাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী নদী তীরের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। মাটি ধরে রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে তীরের চারপাশে দেশীয় গাছপালার সবুজ বলয় তৈরি করা হবে।

জল ব্যবস্থাপনা (Zero-Liquid-Discharge): বর্জ্য জল পুনর্নবীকরণের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা (ZLD) থাকছে। ব্যবহৃত সমস্ত জল শোধন করে পুনরায় নানা কাজে ব্যবহার করা হবে। নদীতে কোনো দূষিত জল ফেলা হবে না, যাতে গঙ্গার জল পরিচ্ছন্ন থাকে।

বিনিয়োগ ও লক্ষ্যমাত্রা

এই ঘাটটি তৈরিতে খরচ হবে ২০ কোটি টাকারও বেশি, যা ইডেন রিয়েলটির মূল ১৫০ কোটি টাকার রিভারফ্রন্ট প্রকল্পেরই অংশ (যার মধ্যে একটি ৫-স্টার হোটেলও রয়েছে)। স্থাপত্যবিদ কপিল ভল্লার (Se-arch) নকশায় তৈরি এই ঘাটটির নির্মাণকাজ আগামী গঙ্গা দশেরা উৎসবের আগেই শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট, কলকাতার (SMPK) সহযোগিতায় ও সমর্থনে তৈরি করা হচ্ছে।

কেন্দ্রে 'ইডেন দেবপ্রয়াগ'

শালিমারের লোয়ার ফোরশোর রোডে ৯ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে ইডেন রিয়েলটির ফ্ল্যাগশিপ লাক্সারি আবাসন 'ইডেন দেবপ্রয়াগ'। এতে B+G+28 তলার পাঁচটি টাওয়ার থাকবে। এটি শালিমার রোডের বিস্তৃত ৩৮ একরের 'কলকাতা ওয়েস্টশোর' পরিকল্পনার একটি অংশ।

সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের অনন্য মডেল

নদী পুনরুজ্জীবনের জন্য ভারত সরকারের 'নমামি গঙ্গে' (Namami Gange) প্রকল্পের ভাবনার সাথেই এই উদ্যোগটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে কোনো বেসরকারি ডেভেলপার নিজস্ব খরচে সরকারি নদীর তীরকে সাধারণ মানুষের জন্য সাজিয়ে তুলছে, যেখানে কারিগরি সাহায্য দিচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সহযোগিতা করছে পোর্ট কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘাটটি সব সাধারণ নাগরিকের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

"গঙ্গা এই শহরকে প্রাণ দিয়েছে। বিশ্ব নদী দিবসে আমরা নদীকে কিছু ফিরিয়ে দিতে পেরে গর্বিত। আমাদের এই ঘাট কেবল আবাসনের বাসিন্দাদের জন্য নয়; এটি হাওড়া ও কলকাতার মানুষের জন্য একটি উপহার, যেখানে ঐতিহ্য, সমাজ ও নদী আবার একসূত্রে বাঁধবে।"

— আর্য সুমন্ত, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইডেন রিয়েলটি গ্রুপ

ইডেন রিয়েলটি সম্পর্কে:

২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইডেন রিয়েলটি গ্রুপ এপর্যন্ত ৭.১ মিলিয়ন বর্গফুট এলাকা নির্মাণ করে তুলে দিয়েছে এবং ৬.৫ মিলিয়ন বর্গফুটের কাজ বর্তমানে চলছ। ১১,০০০-এরও বেশি পরিবারের আস্থা অর্জন করেছে এই প্রতিষ্ঠান।

Comments

Popular posts from this blog

হুগলির মালিয়ার পশ্চিম পাড়ায় এঞ্জেল উড এর আয়োজনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির

ICCR হলে " বঙ্গরত্ন সন্মান " পেলেন বিশিষ্ঠ সেতার শিল্পী বাণী মুখোপাধ্যায়

অশোক ঘোষ স্টাডি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো পালক প্রকাশনের আয়োজনে কবিতা নিয়ে আলোচনা, আবৃত্তি ও কবিতা পাঠ