২ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ইসকন নিউটাউন কলকাতা জন্মাষ্টমী মহোৎসব ২০২৬
সাংবাদিক কেকা মিত্র
ইসকন নিউটাউন কলকাতা বিগত বছরের মতন আগামী ২ থেকে ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ আয়োজন করেছে শ্রীশ্রী কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী মহোৎসব ২০২৬ উদযাপন অনুষ্ঠান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে আয়োজিত এই মহোৎসব এক মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব, যার উদ্দেশ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন বাণী-সম্প্রীতি, করুণা এবং টেকসই জীবনযাপনের আদর্শ-সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
শ্রীশ্রী কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী উৎসব উপলক্ষে আজ বিশেষ এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো । এই সাংবাদিক সম্মেলনে ইস্কন এর পক্ষে অনন্ত ভগবান দাস বলেন
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবারসন্ধ্যায় অধিবাস ও হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে শুভ সূচনা হবে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী মহোৎসবের।৩ সেপ্টেম্বর- জন্মাষ্টমী উৎসবের সাংস্কৃতিক উদ্বোধন দিনের সূচনা হবে মঙ্গল আরতি, জপ, গুরুপূজা এবং বিশেষ দর্শনের মাধ্যমে। সকালে অনুষ্ঠিত হবে শ্রীমদ্ভাগবতমের বিশেষ আলোচনা।
সন্ধ্যায় থাকবে 'আরোহন'-এর পরিবেশনায় ভক্তিমূলক সঙ্গীত, নৃত্য, শ্লোক আবৃত্তি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কৃষ্ণকথা।এই ইস্কন অন্যতম গোবিন্দ ঘোষ দাস সম্মেলনে বলেন ৪ সেপ্টেম্বর - প্রধান জন্মাষ্টমী উৎসব সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কৃষ্ণকথা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।
বিশেষ মধ্যরাত্রির জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান রাত ১০:৩০ থেকে ১১:৩০ পর্যন্ত প্রধান মঞ্চে মন্দিরের পূজারিদের দ্বারা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের বিশেষ অভিষেক অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর রাত ১১:৩০ থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ কৃষ্ণকথা।ঠিক রাত ১২টায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাবের পবিত্র ক্ষণ বিশেষ দর্শনের মাধ্যমে উদ্যাপিত হবে। এই মহাপবিত্র মুহূর্তে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা ভগবানের মনোমুগ্ধকর ও দিব্য বিগ্রহ দর্শনের সুযোগ লাভ করবেন।
ইস্কন এর পক্ষে শিবানন্দ সেন দাস সাংবাদিক সম্মেলনে জানালেন ৫ সেপ্টেম্বর-শ্রীল প্রভুপাদের স্মরণ ও গুরুপূজাএই দিনটি উৎসর্গ করা হবে পরম পূজ্য আচার্য-প্রবর্তক শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। কর্মসূচির মধ্যে থাকবে পুষ্পাঞ্জলি, কীর্তন, শ্রীল প্রভুপাদ অভিষেক, ব্যাসপূজা নিবেদন এবং গুরুপূজা।
চার দিনব্যাপী উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ চার দিনব্যাপী এই মহোৎসব জুড়ে ভক্তবৃন্দ ও বিশিষ্ট শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হবে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, নৃত্য, শ্লোক আবৃত্তি, নাট্যাভিনয় এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন মহিমাকে উদ্যাপন করবে।
এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হবে চার দিনে প্রায় দুই লক্ষ ভক্ত, দর্শনার্থী ও অতিথির মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ, যা এই পবিত্র উৎসবকে ভক্তি, সেবা এবং আধ্যাত্মিক মিলনমেলার এক অনন্য উপলক্ষে পরিণত করবে। এইভাবে সমগ্র মহোৎসব আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি, সংস্কৃতি এবং আনন্দের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্রে পরিণত হবে। এবারের ভাবনা
"গোমাতাকে রক্ষা করুন, গ্রামকে সংরক্ষণ করুন, পৃথিবীকে সুস্থ করে তুলুন।"
এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে ইসকন নিউটাউন কলকাতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা এবং গোবর্ধনের জীবনদর্শনের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাকে তুলে ধরতে চায়-যেখানে গো-রক্ষা, কৃষি, গ্রামভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক মানবজাতির জন্য আরও সুস্থ, সুষম ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক হতে পারে।
গোবর্ধনের লীলা আমাদের সামনে এমন এক চিরন্তন আদর্শ উপস্থাপন করে, যেখানে গোমাতা, কৃষি, প্রকৃতি এবং মানবসমাজ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামঞ্জস্যের মাধ্যমে বিকশিত হয়। বৃন্দাবনের গোপসমাজে গোমাতাকে কখনও কেবল দুধের উৎস হিসেবে দেখা হতো না; কৃষিকেও শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। গরু, উর্বর ভূমি, কৃষক, জল, চরাঞ্চল এবং সমগ্র সমাজ ছিল একটি অবিচ্ছেদ্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীল জীবন্ত ব্যবস্থা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন লীলার মাধ্যমে এই সমন্বিত জীবনদর্শনের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বৃন্দাবনের অধিবাসীদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁদের জীবিকা ও জীবনধারণের মূল উৎস-গোমাতা, কৃষিজমি এবং গোবর্ধন পর্বতকে-সম্মান ও সুরক্ষা করতে। কারণ এই পর্বতই ঘাস, জল এবং নানা প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস ছিল। সমাজজীবনের কেন্দ্রে গোমাতা, ভূমি এবং সম্প্রদায়কে স্থান দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়েছিলেন যে প্রকৃতি ও প্রাণীর ক্ষতি না করেও প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
আজকের বিশ্বেও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গোমাতাকে কৃষি লালন করতে পারে, আবার গোমাতাও কৃষিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কৃষিজমিতে উৎপন্ন পশুখাদ্য ও ফসলের অবশিষ্টাংশ গোমাতার খাদ্য হতে পারে, আর বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবস্থাপিত ও কম্পোস্ট করা গোবর মাটিতে
মূল্যবান জৈব উপাদান ও পুষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। এর ফলে গরু, কৃষক, মাটি এবং সমাজের মধ্যে একটি পুনর্জীবনশীল ও পরস্পর-সহায়ক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অতএব, গোবর্ধন কেবল প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের একটি চিত্র নয়; এটি আধুনিক ও দায়িত্বশীল টেকসই জীবনযাপনের এক অনুপ্রেরণামূলক মডেল। এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা গরুর আজীবন সুরক্ষা নিশ্চিত করে, কৃষির সঙ্গে তাদের অর্থবহ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, গ্রামীণ সমাজকে শক্তিশালী করে এবং মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
গোবর্ধনের শিক্ষা সহজ, অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ-যে উৎস আমাদের জীবনধারণের ভিত্তি, তাকে রক্ষা করলেই প্রকৃত ও টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব।
ভবিষ্যতের জন্য এক উৎসব, এক বার্তা জন্মাষ্টমী কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও শিক্ষায় নিহিত চিরন্তন মূল্যবোধ-করুণা, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য, সকল জীবের প্রতি মমত্ববোধ এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধভিত্তিক জীবন-পুনরাবিষ্কারের এক অনন্য সুযোগ।
গোবর্ধনের শিক্ষা এবং শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর এই মহোৎসবের মাধ্যমে ইসকন নিউটাউন কলকাতা প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারকে গরু, গ্রাম, কৃষি, প্রকৃতি এবং একে অপরের সঙ্গে আরও সহানুভূতিশীল ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।
যখন ভক্তবৃন্দ কীর্তন, প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শ্রীকৃষ্ণ স্মরণে একত্রিত হন, তখন এই উৎসবের বার্তা মন্দিরের গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র সমাজের উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হয়- গোমাতাকে রক্ষা করলে আমরা করুণাকে সম্মান জানাই।
গ্রামকে সংরক্ষণ করলে আমরা সমাজকে শক্তিশালী করি। পৃথিবীকে সুস্থ করে তুললে আমরা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করি। ইসকন নিউটাউন কলকাতার এই জমির পরিমাণ ৩০ একর। ২০২৩ সাল থেকে এই নিউ টাউনে এই উৎসব হচ্ছে। এই চারদিনে ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করেন দু লক্ষ র বেশি ভক্তগণ। এখানে সবার আমন্ত্রণ।


Comments
Post a Comment